: কাঞ্চনবাড়ির অভিশাপ
অধ্যায় ১: নিষিদ্ধ বাড়ির গল্প
কাঞ্চনবাড়ি—একটি পুরোনো, ধসে পড়া প্রাসাদ, যা শহরের শেষ প্রান্তে ধানখেতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর ধরে। জায়গাটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত, কারণ বহু বছর আগে এখানে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল। গুজব বলে, বাড়িটিতে যারা যায়, তারা আর ফিরে আসে না। রাতের বেলা সেখানে কান্নার শব্দ শোনা যায়, বাতাসে ভেসে আসে এক অদ্ভুত পোড়া গন্ধ।
গ্রামের বৃদ্ধেরা বলে, একসময় এটি ছিল জমিদার কাঞ্চন সিংহের প্রাসাদ। তার নববধূ রেণুকা একদিন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। কেউ বলে, তাকে হত্যা করা হয়েছিল, আবার কেউ বলে, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে তার আত্মা এখনো বাড়িটির করিডোরে ঘুরে বেড়ায়।
এই গল্পগুলো সাধারণত গ্রামের মানুষদের ভীত করে রাখে, কিন্তু তিন বন্ধু—রাফি, ইমরান, আর মিথিলা—এসব কাহিনিতে বিশ্বাস করে না। তারা রহস্য ভালোবাসে, ভয় পায় না।
"ভূত-টুত বলে কিছু নেই!" ইমরান হাসতে হাসতে বলে।
"চলো, একবার দেখে আসি কাঞ্চনবাড়িতে আসলে কী আছে!" রাফি উৎসাহ দেয়।
মিথিলা একটু দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু সেও রাজি হয়।
তারা সিদ্ধান্ত নেয়, রাত ১২টায় কাঞ্চনবাড়িতে যাবে এবং নিজের চোখে সত্যটা দেখবে।
অধ্যায় ২: রহস্যময় প্রবেশ
রাত ১২টা। আকাশে মেঘ, চাঁদের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। চারপাশ নিস্তব্ধ।
তিন বন্ধু কাঞ্চনবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। বিশাল লোহার গেটটিতে মরিচা পড়ে গেছে, কিন্তু সেটি একটু ঠেলতেই হালকা শব্দ করে খুলে যায়, যেন কেউ তাদের স্বাগত জানাচ্ছে।
ভেতরে ঢুকতেই তিনজনের গা ছমছম করে ওঠে। বাতাস ভারী, যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। টর্চের আলোয় দেখা যায়, ভাঙা মেঝে, ছেঁড়া পর্দা, আর ধুলোয় ঢাকা পুরোনো আসবাবপত্র। দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো ছবি, যেগুলো এত ধুলোময় যে কারও মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
"দেখো! দেয়ালে কীসব আঁচড়ের দাগ!" ইমরান ফিসফিস করে বলে।
রাফি দেয়ালে হাত রাখে। আঁচড়ের দাগগুলো খুব গভীর, যেন কেউ বাঁচার জন্য দেওয়াল খামচে ধরেছিল।
ঠিক তখনই পেছনে দরজা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে যায়।
তিনজন একসঙ্গে চমকে ওঠে!
"কে… কে বন্ধ করল?" মিথিলা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
হঠাৎ দূরের করিডোর থেকে এক নারীর মিহি হাসির শব্দ আসে। সেটা ছিল অশরীরী—বিকৃত ও শীতল!
তিনজনের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
"আমরা কি সত্যিই ভুল করছি?" ইমরান ফিসফিস করে।
রাফি কিছু বলার আগেই টর্চের আলো করিডোরে পড়তেই তারা এক মুহূর্তের জন্য যা দেখে, তা তাদের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়—
সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা, যার চোখ ছিল একেবারে শূন্য, যেন সেখানে কোনো জীবন নেই।
তারপর সে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে!
অধ্যায় ৩: অতীতের ছায়া
তিনজনই দৌড়ে একটি কক্ষে ঢুকে পড়ে এবং দরজা আটকে দেয়।
"আমরা… আমরা কি সত্যি ভূতের দেখা পেলাম?" মিথিলা কাঁপতে কাঁপতে বলে।
হঠাৎ আলমারির ভেতর থেকে এক বিকট শব্দ হয়।
রাফি ধীরে ধীরে দরজা খুলে দেখে, ভেতরে একটি পুরোনো ডায়েরি রাখা। সে ডায়েরিটি তুলে নেয় আর প্রথম পৃষ্ঠাটি পড়ে—
"১৮৯৭ সাল, ২৩ মার্চ। আমি রেণুকা। এই বাড়ির নববধূ। আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু তার পরিবার আমাকে মেনে নেয়নি। তারা আমাকে এই বাড়ির গোপন কক্ষে বন্দি করে রেখেছে। আমি সাহায্য চেয়েছি, কিন্তু কেউ আসেনি।"
"ওহ মা!" মিথিলা চিৎকার দিয়ে ডায়েরি ফেলে দেয়।
ঠিক তখনই শোনা যায় এক নারীর কান্নার শব্দ।
করিডোরের এক কোণে, সাদা শাড়ি পরা মহিলাটি বসে কাঁদছে।
"আমাকে সাহায্য করো…"
অধ্যায় ৪: অভিশাপের সূত্র
"আমরা কি… তাকে সাহায্য করব?" মিথিলা বলল।
"তুমি পাগল? দৌড়াও!" ইমরান চেঁচিয়ে উঠল।
কিন্তু রাফি এগিয়ে গেল, "তোমার নাম রেণুকা, তাই তো?"
মহিলাটি মাথা তুলল, তার চোখে এবার শূন্যতার বদলে কান্না ছিল।
"আমাকে মুক্ত করো…"
রাফি ডায়েরির শেষ পাতাটি পড়ল—"যদি কেউ আমার গল্প শোনে এবং আমার কথা বিশ্বাস করে, তবে আমি মুক্তি পাব।"
"আমি বিশ্বাস করি!" রাফি চিৎকার করে বলে।
চারপাশে বাতাস তীব্র গতিতে বইতে থাকে, কাঞ্চনবাড়ির ভেতরের সবকিছু কাঁপতে থাকে, আর রেণুকার শরীর থেকে এক ঝলক উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসে!
তিনজন চোখ বন্ধ করে ফেলে।
পরের মুহূর্তেই সব শান্ত হয়ে যায়। কাঞ্চনবাড়ির অভিশপ্ত অনুভূতিও যেন মিলিয়ে গেছে। দরজা আপনা-আপনি খুলে যায়।
তিনজন দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে। কাঞ্চনবাড়ি তখনও দাঁড়িয়ে, কিন্তু এবার আর তা ভয়ংকর লাগছিল না।
শেষ অধ্যায়: নতুন সূচনা
পরের দিন সকালে তারা গ্রামবাসীদের ঘটনাটি জানায়। এক বৃদ্ধা চোখ ভিজিয়ে বলে, "রেণুকার আত্মা হয়তো এতদিন মুক্তির অপেক্ষায় ছিল…"
এরপর থেকে আর কেউ কাঞ্চনবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পায়নি। বাড়িটি পরিত্যক্তই রয়ে গেল, তবে এবার সেটি কেবল এক পুরোনো ইট-পাথরের বাড়ি, কোনো অভিশপ্ত স্থান নয়।
তিন বন্ধুর কাছে এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় রাত—এক রাতে তারা এক অভিশপ্ত আত্মাকে মুক্তি দিয়েছিল।
সমাপ্ত
0 Comments