পর্ব ১: অজানা গ্রামে পথভ্রষ্ট
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। আকাশে মেঘের আনাগোনা, জ্যোৎস্নার আলো মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছে কালো ছায়ায়। সুব্রত সাইকেল চালিয়ে গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। সে একটি সরকারি সংস্থার জরিপকারী, বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে জমির পরিমাপ করে। আজ সে এসেছে মালঞ্চ নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। কাজ শেষ হতে রাত হয়ে গেছে, তাই এখন পাশের গ্রাম নবগ্রাম-এ ফিরছে।
গ্রামের পথ আঁকাবাঁকা, গাছগাছালিতে ঘেরা। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ করেই হালকা কুয়াশার মতো কিছু একটা সামনে ভেসে উঠল। সুব্রত প্রথমে ভেবেছিল চোখের ভুল, কিন্তু যখনই সামনে তাকাল, দেখল কুয়াশার মাঝখানে একটি অস্পষ্ট অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।
সে আচমকা ব্রেক কষল। অবয়বটি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো—একজন বৃদ্ধ, হাতে একটা লাঠি। তার চেহারায় এক অদ্ভুত শূন্যতা, চোখদুটো গর্তের মতো গভীর।
"এই রাতে কোথায় যাচ্ছো বাবা?" বৃদ্ধ কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
সুব্রত একটু হেসে বলল, "নবগ্রাম যাব, দাদু। এই রাস্তা ঠিক আছে তো?"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল, "ঠিক আছে, তবে সাবধানে যেও। রাত বেশি হলে পথ হারিয়ে ফেলবে!"
সুব্রত কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি পেল। কিন্তু কিছু না বলে আবার সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে গেল। কিছুদূর যেতেই সে খেয়াল করল, রাস্তা যেন বদলে গেছে! যেখানে মাটির রাস্তা থাকার কথা, সেখানে এখন পাথর বিছানো পথ। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, গাছগুলোও যেন অন্যরকম।
আর ঠিক তখনই সে দেখতে পেল সামনে একটা পুরনো, ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। মন্দিরের চারপাশে অদ্ভুত সাদা ফুল ফুটে আছে, আর সেখান থেকে এক অজানা সুগন্ধ আসছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মন্দিরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা সাদা পোশাকের নারী।
পর্ব ২: অচেনা রমণী
সুব্রত মন্দিরের সামনে এসে থামল। মেয়েটির মুখ সে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না, চুলে ঢাকা। কিন্তু তার পোশাক, তার ভঙ্গিমা—সবকিছুই যেন রহস্যে ঘেরা।
"কে আপনি?" সুব্রত জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখদুটো কেমন যেন ফাঁকা, প্রাণহীন। ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি।
"আমি এখানে থাকি। তুমি কেন এসেছ?" মেয়েটির গলা যেন কুয়াশার মতো আবছা শোনালো।
সুব্রত একটু অস্বস্তিতে পড়ল। "আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। নবগ্রাম কোন দিকে যেতে হবে, বলতে পারেন?"
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, "এই রাস্তা দিয়ে সোজা গেলে একটা পুরনো আমগাছ পাবে, তার পাশ দিয়ে বাঁ দিকে চলে যাও। কিন্তু মনে রেখো, কোনো কিছু শুনলেও থামবে না!"
সুব্রত বিস্মিত হলো, কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে সাইকেল চালাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই সে দেখতে পেল বিশাল এক আমগাছ। সে মেয়েটির কথামতো বাঁ দিকে মোড় নিল।
আর তখনই শুরু হলো ভয়ানক ঘটনা।
পর্ব ৩: নিশির ডাক
চুপচাপ হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই পেছন থেকে কণ্ঠ এল—
"সুব্রত!"
গলার স্বরটা চেনা চেনা লাগল। সে দাঁড়িয়ে পড়ল। কেউ কি তাকে ডাকল? পেছনে তাকাল, কিন্তু কিছুই নেই।
"সুব্রত, আমি তোর বন্ধু দীপক! পেছনে তাকা, আমাকে চিনতে পারছিস না?"
সুব্রত চমকে উঠল। দীপক তার ছোটবেলার বন্ধু, কিন্তু বছর পাঁচেক আগে একটা দুর্ঘটনায় মারা গেছে! তাহলে এই গলা কার?
সে দ্রুত হাঁটতে লাগল। কিন্তু এবার গলার স্বর আরও কাছ থেকে এল—
"তুই আমাকে ভুলে গেছিস? পেছনে তাকা!"
গলার স্বর এবার ভয়ঙ্কর রকমের ঠান্ডা। সুব্রত কাঁপতে কাঁপতে ছুটতে শুরু করল। পথের দু’পাশের গাছের ছায়াগুলো যেন হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে চাইছে। চারপাশে অদ্ভুত ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে।
আর ঠিক তখনই, সে সামনে দেখতে পেল সেই বৃদ্ধকে, যাকে সে রাস্তার মোড়ে দেখেছিল!
বৃদ্ধ এবার হাত বাড়িয়ে বলল, "থামো! এগিয়ে যেও না!"
কিন্তু সুব্রত তখন দৌড়ে চলছে। সে বৃদ্ধকে পাশ কাটিয়ে ছুটতে লাগল।
পর্ব ৪: ভয়ানক সত্য
সকালে গ্রামের কয়েকজন লোক নবগ্রামের কাছের এক ছোট নদীর ধারে একটা অজ্ঞান অবস্থায় লোককে পড়ে থাকতে দেখল। তারা এগিয়ে এসে দেখল, লোকটা সুব্রত। তার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা, চোখ দুটো খোলা কিন্তু ফাঁকা।
গ্রামের পুরোহিত এলেন। তিনি বললেন, "ও নিশির ডাক শুনেছিল। ভাগ্য ভালো যে সাড়া দেয়নি, নাহলে আর বেঁচে থাকত না!"
সুব্রত ধীরে ধীরে উঠে বসল। গতরাতের কথা মনে পড়তেই তার শরীর শিউরে উঠল।
এক বৃদ্ধ এসে বলল, "তুমি ভাগ্যবান, বাবা। এই এলাকায় বহু মানুষ রাতের অন্ধকারে পথ হারিয়ে নিশির খপ্পরে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুমি সময়মতো পালিয়ে আসতে পেরেছ।"
সুব্রত স্তব্ধ
হয়ে রইল। সে জানত, এই ভয়ংকর রাতের কথা সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না।
0 Comments